পরীক্ষামূলক সংস্করণ মফস্বল সাংবাদিকদের আর কত আত্মহনন? - khojnews
আজ মঙ্গলবার || ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ || ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মফস্বল সাংবাদিকদের আর কত আত্মহনন?

দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর সাবেক প্রধান পুলক চ্যাটার্জি শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন—এই সংবাদ শুধু একজন সাংবাদিকের চলে যাওয়া নয়, এটি আমাদের সাংবাদিকতা-ব্যবস্থার বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো এক নির্মম প্রশ্ন। পুলক চ্যাটার্জির এই পরিণতির পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত ও সময়ই বলবে। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়া আমাদের সামনে মফস্বল সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে নতুন করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

মফস্বলের একজন সাংবাদিক কেবল সংবাদ পাঠান না; তিনি দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের পাশে দাঁড়ান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, প্রত্যন্ত জনপদের অজানা গল্প তুলে আনেন। নিজের সময়, তারুণ্য, মেধা, আবেগ ও স্বপ্ন উজাড় করে একটি প্রতিষ্ঠানের সংবাদভিত্তি শক্ত করেন। অথচ সেই সাংবাদিকের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন কোথায়?

অনেক ক্ষেত্রেই মফস্বল সাংবাদিকতার শুরুটা হয় আবেগ দিয়ে, আর শেষটা হয় এক গভীর হতাশায়। বছরের পর বছর প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে কিংবা নামমাত্র সম্মানীতে কাজ করতে করতে একজন সাংবাদিক যখন তাঁর তারুণ্য, সময় ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দিয়ে দেন, তখন একদিন তাঁকেই যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়তে হয়। ভালোভাবে বললে—বিদায় করে দেওয়া হয়। অথচ তাঁর পেছনে পড়ে থাকে না কোনো নিরাপত্তা, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ কিংবা দীর্ঘদিনের শ্রমের স্বীকৃতি। এ যেন এক অদৃশ্য চক্র—তারুণ্যকে কাজে লাগাও, আবেগকে পুঁজি করো, বছরের পর বছর শ্রম নাও; তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে নিঃশব্দে সরিয়ে দাও। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া যায় ?

মফস্বল সাংবাদিকরা প্রতিদিন শুধু সংবাদ সংগ্রহ করেন না, তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়েই এক ধরনের নীরব আত্মত্যাগ করে চলেন। কেউ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন, কেউ সামাজিক চাপের সঙ্গে, কেউ রাজনৈতিক ও পেশাগত ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থাকছেন। বাইরে থেকে তাঁদের হাতে থাকা কলমটি দৃশ্যমান; কিন্তু সেই কলমের পেছনে জমে থাকা ক্লান্তি, অভিমান, অপমান ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাসটি আমরা কতটা দেখতে পাই? পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া তাই আমাদের থমকে দিয়েছে। প্রশ্ন জাগে—এই ব্যবস্থার ভেতরে আর কতজন পুলক নীরবে ভেঙে পড়ছেন? আর কতজন মফস্বল সাংবাদিক প্রতিদিন একটু একটু করে আত্মহনন করতে করতে বেঁচে আছেন? আর কতজনের স্বপ্ন, আত্মমর্যাদা ও দীর্ঘদিনের শ্রম একদিন হঠাৎ করেই মূল্যহীন হয়ে যাবে?

এইভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও কোনো সাংবাদিক এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে সেটিকে নিছক ব্যক্তিগত ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। প্রতিটি এমন মৃত্যু আমাদের সাংবাদিকতা-ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলবে; প্রশ্ন করবে—যাঁরা এতদিন মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ছিলেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর শোনার মানুষ কোথায়? একজন মফস্বল সাংবাদিককে করুণা নয়, প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে। তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। দীর্ঘদিনের পেশাগত অবদানকে সম্মান করতে হবে। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।

কারণ সংবাদপত্র শুধু কাগজে ছাপা অক্ষরের সমষ্টি নয়। তার প্রতিটি সংবাদের পেছনে থাকে কোনো না কোনো মানুষের ঘাম, সময়, ঝুঁকি এবং জীবন।
সেই মানুষগুলোকে যদি আমরা কেবল প্রয়োজনের সময়ে ব্যবহার করি, আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দিই—তাহলে একদিন হয়তো সংবাদপত্র থাকবে, সংবাদ থাকবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে সেই মানুষটি, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদটি আমাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া আমাদের সেই কঠিন সত্যটির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখনই সময় মফস্বল সাংবাদিকতার মানুষগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর। একজন সাংবাদিককে হারানোর পর শোক প্রকাশ করার চেয়ে, তাঁকে বেঁচে থাকার মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়াই অনেক বেশি জরুরি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাতক্ষীরা।

ট্যাগ :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয়

সৌদির বিরুদ্ধে ইরান যুদ্ধ করছে না: পেজেশকিয়ান

মফস্বল সাংবাদিকদের আর কত আত্মহনন?

আপডেট টাইম : ০৮:৪৮:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরোর সাবেক প্রধান পুলক চ্যাটার্জি শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন—এই সংবাদ শুধু একজন সাংবাদিকের চলে যাওয়া নয়, এটি আমাদের সাংবাদিকতা-ব্যবস্থার বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো এক নির্মম প্রশ্ন। পুলক চ্যাটার্জির এই পরিণতির পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত ও সময়ই বলবে। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়া আমাদের সামনে মফস্বল সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে নতুন করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

মফস্বলের একজন সাংবাদিক কেবল সংবাদ পাঠান না; তিনি দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের পাশে দাঁড়ান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, প্রত্যন্ত জনপদের অজানা গল্প তুলে আনেন। নিজের সময়, তারুণ্য, মেধা, আবেগ ও স্বপ্ন উজাড় করে একটি প্রতিষ্ঠানের সংবাদভিত্তি শক্ত করেন। অথচ সেই সাংবাদিকের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন কোথায়?

অনেক ক্ষেত্রেই মফস্বল সাংবাদিকতার শুরুটা হয় আবেগ দিয়ে, আর শেষটা হয় এক গভীর হতাশায়। বছরের পর বছর প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে কিংবা নামমাত্র সম্মানীতে কাজ করতে করতে একজন সাংবাদিক যখন তাঁর তারুণ্য, সময় ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দিয়ে দেন, তখন একদিন তাঁকেই যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়তে হয়। ভালোভাবে বললে—বিদায় করে দেওয়া হয়। অথচ তাঁর পেছনে পড়ে থাকে না কোনো নিরাপত্তা, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ কিংবা দীর্ঘদিনের শ্রমের স্বীকৃতি। এ যেন এক অদৃশ্য চক্র—তারুণ্যকে কাজে লাগাও, আবেগকে পুঁজি করো, বছরের পর বছর শ্রম নাও; তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে নিঃশব্দে সরিয়ে দাও। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া যায় ?

মফস্বল সাংবাদিকরা প্রতিদিন শুধু সংবাদ সংগ্রহ করেন না, তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়েই এক ধরনের নীরব আত্মত্যাগ করে চলেন। কেউ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন, কেউ সামাজিক চাপের সঙ্গে, কেউ রাজনৈতিক ও পেশাগত ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থাকছেন। বাইরে থেকে তাঁদের হাতে থাকা কলমটি দৃশ্যমান; কিন্তু সেই কলমের পেছনে জমে থাকা ক্লান্তি, অভিমান, অপমান ও অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাসটি আমরা কতটা দেখতে পাই? পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া তাই আমাদের থমকে দিয়েছে। প্রশ্ন জাগে—এই ব্যবস্থার ভেতরে আর কতজন পুলক নীরবে ভেঙে পড়ছেন? আর কতজন মফস্বল সাংবাদিক প্রতিদিন একটু একটু করে আত্মহনন করতে করতে বেঁচে আছেন? আর কতজনের স্বপ্ন, আত্মমর্যাদা ও দীর্ঘদিনের শ্রম একদিন হঠাৎ করেই মূল্যহীন হয়ে যাবে?

এইভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও কোনো সাংবাদিক এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে সেটিকে নিছক ব্যক্তিগত ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। প্রতিটি এমন মৃত্যু আমাদের সাংবাদিকতা-ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলবে; প্রশ্ন করবে—যাঁরা এতদিন মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ছিলেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর শোনার মানুষ কোথায়? একজন মফস্বল সাংবাদিককে করুণা নয়, প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে। তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। দীর্ঘদিনের পেশাগত অবদানকে সম্মান করতে হবে। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।

কারণ সংবাদপত্র শুধু কাগজে ছাপা অক্ষরের সমষ্টি নয়। তার প্রতিটি সংবাদের পেছনে থাকে কোনো না কোনো মানুষের ঘাম, সময়, ঝুঁকি এবং জীবন।
সেই মানুষগুলোকে যদি আমরা কেবল প্রয়োজনের সময়ে ব্যবহার করি, আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দিই—তাহলে একদিন হয়তো সংবাদপত্র থাকবে, সংবাদ থাকবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে সেই মানুষটি, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদটি আমাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া আমাদের সেই কঠিন সত্যটির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখনই সময় মফস্বল সাংবাদিকতার মানুষগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর। একজন সাংবাদিককে হারানোর পর শোক প্রকাশ করার চেয়ে, তাঁকে বেঁচে থাকার মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়াই অনেক বেশি জরুরি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাতক্ষীরা।